মাসকলাই ডাল (Black gram)

0
220

পরিচিতি

বাংলা নাম : মাসকলাই
ইংরেজী নাম : Black gram
বৈজ্ঞানিক নাম :
পরিবার ; Leguminosae

বাংলাদেশের প্রচলিত ডাল ফসলের মধ্যে মাসকলাইয়ের স্থান চতুর্থ। দেশের মোট উৎপাদিত ডালের ৯-১১% আসে মসকলাই থেকে। দেশের উত্তর ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাসকলাইয়ের মোট আবাদী জমির পরিমান প্রায় ১ লক্ষ হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন।

মাসকলাইয়ের জাত

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত মাসকলাইয়ের ৩টি উন্নত জাত হল বারি মাস- (পান্থ), বারি মাস-২ (শরৎ), বারি মাস-৩ (হেমন্ত)। বারি উদ্ভাবিত এ জাতমসূহ কৃষক আবাদ করে দেশের ডালের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব।

বারি মাস-১ (পান্থ)
১৯৮১ সালে ভারত থেকে পান্থ-৩০ নামে মাসকলাইয়ের একটি অগ্রবর্তী লাইন আনা হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষার মাধ্যমে এ জাত উচ্চ ফলনশীল হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ১৯৯০ সালে কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য বারি মাস-১ বা পান্থ নামে অনুমোদন করা হয়। গাছের উচ্চতা ৩২-৩৬ সেমি। এ জাতের বীজের রং কালচে বাদামি। বীজের আকার বড়। হাজার বীজের ওজন ৩৮-৪৩ গ্রাম। জাতটি দিবস নিরপেক্ষ হওয়ার ফলে খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমে চাষ করা যায়। ডাল রান্নার সময়কাল ৩০-৩৫ মিনিট। অমিষের পরিমাণ ২১-২৩%। জীবনকাল ৬৫-৭০ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৪-১.৫ টন। এ জাতে হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

বারি মাস-২ (শরৎ)
মাসকলাইয়ের এই জাতটি ১৯৮৭ সালে বি এম এ-২১৪১ এবং বি এম এ-২১৪০ অগ্রবর্তী লাইনের মধ্যে সংকরায়ন করে উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষার নিরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে এ জাতটি দেশে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন করা হয়। গাছের আকার মধ্যম। গাছের উচ্চতা ৩৩-৩৫ সেমি। স্থানীয় জাতের মত লতানো হয় না। পত্র ফলক মাঝারি সরু। পাকা ফলের রং কালচ। ফল খাড়া, ফলের গায়ে শুং আছে। বীজের রং কালচে। বীজের আকার স্থানীয় জাতের চেয় বেশ বড়। হাজার বীজের ওজন ৩২-৩৬ গ্রাম। ডাল রান্নার সময়কাল ৩০-৩৫ মিনিট। অমিষের পরিমাণ ২১-২৪%। জীবনকাল ৬৫-৭০ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৪-১.৬ টন। এ জাতি দিবস নিরপেক্ষ। এ জাতে হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

মাশকালাই ডাল ছাল ছাড়ানোর পর

বারি মাস-৩ (হেমন্ত)
মাসকলাইয়ের এই জাতটি ভারত থেকে সংগৃহীত লাইন বি এম এ-২১৪০ এবং বি এম এ-২০৩৮ এর মধ্যে সংকরায়ন প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবন করা হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষার নিরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে এ জাতটি দেশে অনুমোদন করা হয়। গাছের আকার মধ্যম। গাছের উচ্চতা ৩৫-৩৮ সেমি। স্থানীয় জাতের মত লতানো হয় না। ফল পাকলে ফলের রং কাল হয়। শুটিতে ঘন শুং আছে। বীজের রং কালচে। বীজের আকার স্থানীয় জাতের চেয় বেশ বড়। হাজার বীজের ওজন ৪০-৪৫ গ্রাম। রান্না হওয়ার সময়কাল ৩০-৩৭ মিনিট। অমিষের পরিমাণ ২১-২৪%। জীবনকাল ৬৫-৭০ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৫-১.৬ টন। এ জাতে হলদে মোজাইক ভাইরাস রোগ সহনশীল।

মাটি ও জমি তৈরী

মাঝরি উঁচু ও সুনিষ্কাশিত জমি এবং বেলে দোআঁশ ও দোআঁশ মাটি মাসকলাইয়ের উৎপাদনের জন্য উপযোগী। ৩-৪টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে জমি ভালভাবে তৈরী করতে হয়।

বীজের হার ও বপন পদ্ধতি

বীজের হার ৩০-৪০ কেজি/হেক্টর, ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে বীজের পরিমান কিছু বেশী দিতে হয়। ছিটিয়ে ও সারি করে বীজ বপন করা যায়। সারিতে বপনের ক্ষেত্রে সরি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেমি রাখতে হবে। খরিফ-২ মৌসুমে ছিটিয়ে বোনা যায়। এলাকা ভেদে বপন সময়ে তারতম্য দেখা যায়। খরিফ-১ মৌসুমে মধ্য ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারীর শেষ হতে মধ্য মার্চ) এবং খরিফ-২ মৌসুমে পহেলা ভাদ্র থেকে ১৫ই ভাদ্র (আগষ্টের ১৫-৩১)। তবে মধ্যে সেপ্টম্বর পর্যন্ত বপন করা যায়।

সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি

অনুর্বর জমিতে হেক্টর প্রতি নিম্নরুপ সার ব্যবহার করতে হয় :

সারের নামসারের পরিমান/হেক্টর
ইউরিয়া৪০-৫০ কেজি
টিএসপি৮০-৮৫ কেজি
এমপি৩০-৩৫ কেজি
অণুজীব সার৪-৫ কেজি
সার এর পরিমান

শেষ চাষের সমুদয় সার প্রয়োগ করতে হবে। অপ্রচলিত এলাকায় আবাদের জন্য সুপারিশ মত নির্দিষ্ট অণুজীব সার প্রয়োগ কর যেতে পারে। প্রতি কেজি বীজের জন্য ৮০ গ্রাম হারে অনুজীব সার প্রয়োগ করতে হবে। ইনোকুলাম সার ব্যবহার করলে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে না।

অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা

বপনের ২০ দিনের মধ্যে একবার আগাছা দমন করা প্রয়োজন। বৃষ্টিপাতের ফলে যাতে জলঅবদ্ধতার সৃষ্টি না হয় সে জন্য অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

মাশকালাই খেত

রোগবালাই দমন

মাসকলাইয়ের পাতার দাগ রোগ দমন
সারকোস্পোরা ক্রয়েন্টা নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। আক্রান্ত পাতার উপর ছোট ছোট লালচে মাদামি গোলাকৃতি হতে ডিম্বাকৃতি দাগ পড়ে। আক্রান্ত অংশের কোষসমূহ শুকিয়ে যায় এবং পাতার উপর ছিদ্র হয়ে যায়। আক্রমণের মাত্রা বেশী হলে সম্পূর্ণ পাতাই ঝলসে যায়। পরিত্যক্ত ফসলের অংশ, বায়ু ও বৃষ্টির ঝাপটার মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। শতকরা ৮০ ভাগের বেশী আর্দ্রতা ও ২৮০ সেমি এর বেশী তাপমাত্রায় এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। প্রতিকার
১। ব্যাভিষ্টিন (০.২%) নামক ছত্রাকনাশক ১২-১৫ দিন অন্তর ২-৩ বার সেপ্র করতে হবে।
২। রোগ প্রতিরোধী জাতের (যেমন বারি মাস-১, ২,৩) চাষ করতে হবে।

মাসকলাইয়ের পাউডারি মিলিডিউ রোগ দমন
ওইডিয়াম প্রজাতির ছত্রাক দ্বারা এ রোগ সৃষ্টি হয়। এ রোগে পাতার উপর পৃষ্ঠে পাউডারের মত আবরন পড়ে। সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে এ রোগের অধিক প্রকোপ দেখা যায়। বীজ, পরিত্যক্ত গাছের অংশ ও বায়ুর মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। প্রতিকার
১। বিকল্প পোষাক ও গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়ে ফেলতে হবে।
২। টিল্ট বা থিওভিট (০.২%) ১০-১২ দিন অন্তর ২-৩ বার সেপ্র করতে হবে।
৩। এছাড়াও ফসল উৎপদনে স্বাস্থ্যসম্মত পরিচর্যা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এতে রোগের প্রকোপ অনেক কমে যাবে।

মাসকলাইয়ের হলদে মোজাইক রোগ দমন
মোজাইক ভাইরাস দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত পাতার উপর হলদে ও গাঢ় সবুজ মিশ্র মোজাইকের মত দাগ পড়ে। দূর থেকে সমগ্র আক্রান্ত মাঠ হলদে বলে মনে হয়। সাধারণত কচি পাতা প্রথমে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত বীজ ও বায়ুর মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। সাদা মাছি (হোয়াইট ফ্লাই) নামক পোকা এ রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে। বিকল্প পোষাক ও সাদা মাছির অধিক্য এ রোগ দ্রুত বিস্তারে সহায়ক। প্রতিকার
১। রোগ মুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে।
২। হোয়াইট ফ্লাই নামক পোকা দমনের জন্য নিয়মিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
৩। আক্রান্ত গাছ পুড়ে ফেলতে হবে।

ফসল সংগ্রহ

খরিফ-১ মৌসুমে মধ্য বৈশাখ (মে মাসের শেষ) এবং খরিফ-২ মৌসুমে মধ্য- কার্তিক (অক্টোবর মাসের শেষ) মাসে ফসল সংগ্রহ করতে হবে।

রিপ্লাই করুন

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন
দয়া এখানে আপনার নাম লিখুন